Sports Bangla

রূপকথার গল্প

রূপকথার গল্প

রূপকথার গল্প
জুন ২২
১৩:১৯ ২০১৫

Kwality (3)মিরপুর শেরে-বংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলছেন মুস্তাফিজুর। কাঁপিয়ে দিচ্ছেন পুরো ভারতকে। অথচ তার খেলা কিনা পরিবারের সদস্যরা এক সঙ্গে বসে দেখতে পারেননি। এমনকি মাঠে বসেও না। শুধুমাত্র তার বোন আর কয়েকজন চাচাতো ভাই-বোন উপস্থিত ছিলেন মিরপুর শেরে-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।

মুস্তাফিজের বাবা এবং দুই ভাই সাতক্ষীরার তেতুলিয়ায় গ্রামের বাড়িতে বসে খেলা দেখেছেন। তার বড় ভাই এবং মা খেলা দেখেছেন খুলনায় বসে। ঢাকায় একটি সংবাদ পত্র অফিসে বসে খেলা দেখেছেন তার চাচা। যখনই মুস্তাফিজুর উইকেট নিয়েছেন, তখনই ফোনে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে আনন্দ উদযাপন করলেন।

প্রথম ম্যাচের ন্যায় দ্বিতীয় ম্যাচেও ৫ উইকেট নেওয়ার গৌরব অর্জণ করলেন মুস্তাফিজ। বরং, প্রথম ম্যাচের তুলনায় একটি বেশি পেলেন দ্বিতীয় ম্যাচে। জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান ভিতোরির পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে অভিষেকেই পর পর দুই ম্যাচে ৫টি করে উইকেট নিলেন মুস্তাফিজ। ভিতোরির চেয়ে একটি উইকেট বেশি নিলেন তিনি। প্রায় দুই ঘণ্টা বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকার পর খেলা শুরু হতে না হতেই বোল্ড করলেন রবিন্দ্র জাদেজাকে। করেই ইতিহাসে এককস্থানে নাম লিখিয়ে ফেললেন মুস্তাফিজ।

ambiagroupপ্রথম ম্যাচে ৫০ রানে ৫ উইকেট নেওয়ার পরই অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন, ভারত তো এবার তার বল পড়ে ফেলতে পারবে। আগে না হয় তাকে দেখেনি তারা, বোঝেনি। একবার যখন দেখে ফেলেছে, বুঝে ফেলেছে- তখন তো তাকে পড়তে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু বাংলাদেশ কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে তখন জানিয়ে দিলেন, এত সহজ নয়। মুস্তাফিজের তুনে আরও বহু তীর রয়েছে। এগুলোর প্রয়োগ একে একে যখন সে করতে থাকবে, তখন প্রতিক্ষের ব্যাটসম্যানরা দিশেহারা হয়ে যাবে। অসধারণ সব ভ্যারিয়েশন রয়েছে তার বোলিংয়ে।

রোববার মুস্তাফিজ তার তুন থেকে আরও দু’একটা তীর বের করে দেখালেন। তাতেই কুপোকাত ভারতের গর্ব, অহমিকা, দম্ভ। প্রথম স্পেলেই যখন বল করতে এলেন, ইনিংসের একেবারে প্রথম ওভার। দ্বিতীয় বলেই দিলেন কোনাকুনি এক ডেলিভারি। তাতেই উইকেট তুলে নিলেন রোহিত শর্মার।

দ্বিতীয় স্পেলে এসেও একইভাবে বোলিং অব্যাহত রাখলেন। প্রথমেই তুলে নিলেন রায়নার উইকেট। অফকাটারের বলটি হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ব্যাটের কানা ছুঁয়ে চলে যায় উইকেটরক্ষকের হাতে। এরপর তুলে নিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনির উইকেট। প্রথম ম্যাচে যার সঙ্গে ধাক্কা কাণ্ড নিয়ে কম তোলপাড় হয়নি ক্রিকেট বিশ্বে।

Explore1মুস্তাফিজের স্লোয়ার বুঝতেই পারেননি ধোনি। একেবারে বোকা বনে গেলেন। ক্যাচ তুলে দিলেন সৌম্য সরকারের হাতে। ব্যাটিং পাওয়ার প্লের শেষ ওভারেই আউট হন ধোনি। যে কারণে শেষ ১০ ওভার নিশ্চিন্তে খেলতে পেরেছে ভারত।

প্রথম ম্যাচের চেয়ে দ্বিতীয় ম্যাচে মুস্তাফিজের বোলিং বৈচিত্র দেখুন। অক্ষর প্যাটেলকে কিন্তু অফ কাটার কিংবা স্লোয়ার দিয়ে আউট করেননি। সরাসরি এবং দ্রুত এক ডেলিভারিতে তুলে নিলেন অক্ষরের উইকেট। এরপর রবিচন্দ্র অশ্বিনকে দিলেন অফকাটার। অশ্বিনকে তুলে নিয়েই ৫ উইকেটের কোটা তুলে নিলেন তিনি।

এরপরই এলো বৃষ্টি। প্রায় দুই ঘন্টা বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকার পর আবার যখন বল করতে এলেন তখন মাত্র এক বল বাকি ছিল মুস্তাফিজের। সেটাকেই অস্ত্র বানালেন জাদেজার উদ্দেশ্যে। সরাসরি বোল্ড। এটাও ছিল না কাটার কিংবা স্লোয়ার। ছিল স্ট্রেইট কুইকার ডেলিভারি। ছুঁয়ে ফেললেন ৬ উইকেটের মাইলফলক। কিন্তু ১৯ বছরের এই তরুণ যেন এখনও বালক। তার উদযাপন ভঙ্গি দেখলে যে কেউ তাকে বালকই আখ্যা দেবে, সন্দেহ নেই।

খেলা যতক্ষণ না চলছিল, ততক্ষণ পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে কল দিয়েই যাচ্ছিল। তাদের খুব ইচ্ছা করছিল একসাথে বসে তাদের গর্বের ছেলেকে নিয়ে উদযাপন করবে। খেলা উপভোগ করবে। আবারও এটাও চাওয়া, বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ যেন অব্যাহত থাকে। কিন্তু কোনটাই হয় না। দুরত্ব বেশি হওয়ায় এক সাথেও খেলা দেখা হয় না আর লোডশেডিং তো থাকেই।

Bright-sports-shop_bigডেইলি স্টার পত্রিকায় মুস্তাফিজের এক চাচা রয়েছে ডেপুটি চিফ রিপোর্টার হিসেবে। শরিফুল ইসলাম। ক্রিকইনফোকে তিনি জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যরা সবাই টিভির সামনে বসে। এক একজন, এক এক জায়গায়। তবে প্রথম ম্যাচের পুরস্কার বিতরনের সময় সাৎক্ষীরায় লোডশেডিং শুরু হয়ে যায়। এ কারণে, মুস্তাফিজের বড় ভাই খুলনা থেকে চাচা শরিফুলকে ফোন করেন, ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার নেওয়ার সময় কি বলেছিলেন মুস্তাফিজ!

শরিফুল বলেন, ‘আমরা কেউই নিশ্চিত ছিলাম না যে ভারতের বিপক্ষে সে সুযোগ পাবে কি না। শেষ পর্যন্ত সেরা একাদশে সুযোগ পেয়ে গেলো সে। এরপর আমরা চিন্তিত ছিলাম, সে আসলে কেমন করে, এ নিয়ে।

শরিফুল আরও বলেন, ‘মুস্তাফিজ যখন ১৪ সদস্যের দলে ঠাঁই পেয়ে যায় তখন ওহিওতে থাকা আমার এক ভাই ফোন করে বলেছিলেন, যদি একাদশে সুযোগ পায় এবং তিন উইকেট নিতে পারে তাহলে তাকে আমি একটি আইফোন কিনে দেবো।’

এরপরের ইতিহাস তো স্রেফ রূপকথার গল্প। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতেই তুলে নিলেন ৫ উইকেট। ওহিওতে থাকা সেই চাচা সাথে সাথেই কিনে নিলেন একটি আইফোন এবং ভাতিজার কাছে সেই ফোনটি পাঠানোর জন্য লোক খোঁজা শুরু করে দিলেন।

এমন এক সময় ছিল যখন মুস্তাফিজ ঢাকায় এসে কোন ক্লাবেই খেলতে পারছিলেন না, কেউ তাকে নিতে চাইছিল না, তখন তার চাচা এবং ভাই তাকে যোগাযোগ করিয়ে দেন সঠিক স্থানে। যেখান থেকে উপরে ওঠার সিঁড়ি পেয়ে যান তিনি। ট্রায়াল দিতে আসেন পেস ফাউন্ডেশনে।

মুস্তাফিজ নিজেই জানিয়েছেন, এতদুর আসার পেছনে তার পরিবারের পূর্ণ সমর্থন এবং সহযোগিতা পেয়েছেন। এমন পরিবার কয়জনের আছে বলুন!

লেখক সম্পর্কে

স্পোর্টসবাংলা ডেস্ক

স্পোর্টসবাংলা ডেস্ক

এই ধরনের আরো লেখা

০ মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য আসেনি!

এই মুহূর্তে এখানে কোনো মন্তব্য নেই, আপনি কি একটি মন্তব্য দেবেন?

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

এপ্রিল ২০২১
সোমমঙ্গলবুধবৃহস্পতিশুক্রশনিরবি
« আগস্ট  
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০