Sports Bangla

নিঃসঙ্গতার নাম মেসি

নিঃসঙ্গতার নাম মেসি

নিঃসঙ্গতার নাম মেসি
জুলাই ১৫
০৫:৪২ ২০১৪

নীল রংয়ের রেলিংটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন অনেকক্ষণ৷ সামনে অজস্র সিঁড়ি৷ ডাক পড়লেই উঠতে হবে৷ ওপরের দিকে একবার তাকালেন৷ এ যেন উপরে ওঠার সিঁড়ি নয়৷ নীচে নামার সিঁড়ি৷ তার পরে ক্যামেরা তার দিকে তাক করে রয়েছে দেখে নামিয়ে ফেললেন অপাপবিদ্ধ মুখ৷ তার পরে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ দাঁড়িয়ে রইলেন৷ দাঁড়িয়েই রইলেন৷ মুঠোয় ধরা নীল রেলিং৷ আহা, নীল জার্সির সঙ্গে মিলে যায়৷ কিন্ত্ত কী করুণ লিওনেল মেসির সোনার বল আনতে মঞ্চে যাওয়ার দৃশ্য!
তাকানো যাচ্ছে না ও দিকে৷ সিম্পলি তাকানো যাচ্ছে না৷ ফুটবলে বলা হয়, টাইব্রেকার সরণি হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম পথ৷ সেন্টার লাইন থেকে পেনাল্টি মারতে যাওয়ার সময় মনে হয়, পথ আর ফুরোচ্ছে না৷ এ পথ অনন্ত, অন্তহীন৷
রক্তশূন্য মুখের লিও মেসি যখন সোনার বল আনতে মাঠ থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাচ্ছেন, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এটাই সেই পৃথিবীর দীর্ঘতম পথ৷ টাইব্রেকারের চেয়েও জটিল৷ টাইব্রেকারের সময় পাশে লোক থাকে না৷ মনে হয়, বিশ্বে আমিই একা মানুষ৷ এ সময়টা অন্য অনূভূতি৷ এত লোক-তবু মনে হবে, সবাই কেমন ধোঁয়ার মতো মিশে যাচ্ছে দিগন্তে৷
পাশ দিয়ে লোক হাত বাড়াচ্ছে৷ পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে৷ হাতে পুরস্কারটা কে তুলে দিল! মানুয়েল ন্যুয়ার, না অন্য কে, কার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন-মনে হলো না, মেসির মনে থাকবে কিছু৷ স্কোলারি বলছেন, জার্মানির কাছে তার দল ছয় মিনিটের ব্ল্যাক আউটের মধ্যে ছিল৷ এটাও মেসির ‘জার্মানি ব্ল্যাক আউট’৷ তিনি তখন আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না৷ তাকানো যাচ্ছে না ও দিকে৷ সিম্পলি তাকানো যাচ্ছে না৷
পঞ্চান্ন বছর বয়সে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন মেসির দেশের অন্যতম সেরা লেখক, ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’এর অন্যতম স্রষ্টা খিওর্খে ফান্সিসকো বোরহেস৷ মেসির মতোই তিনি ছোটবেলায় চলে গিয়েছিলেন স্পেনে৷ মারাকানায় কান্নার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল, ফুটবল নিয়ে বোরহেসের বিখ্যাত মন্তব্যটাই ঠিক৷ ‘ফুটবল জনপ্রিয়, কেননা নিবুর্দ্ধিতা জনপ্রিয়৷ ফুটবল হল কুৎসিত৷’
ব্রাজিলের একটি কাগজ তাদের ওয়েবসাইট ওই সময়ই ফাইনালের হেডিং করেছে, ‘আর্জেন্টিনা, বলো কেমন লাগে?’ হাজার হাজার আর্জেন্টিনীয়রা এসে এ ক’দিন ব্রাজিলকে বিদ্রুপ করে গান গেয়েছে, ‘বলো, ব্রাজিল কেমন লাগে?’ তারই পাল্টা৷
ততক্ষণে তার নিজের টিভি শোতে, স্টুডিওয় বসে ম্যারাডোনা প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সোনার বলটা মেসি পেল কী করে? এটা পাওয়া উচিত ছিল হামেস রদ্রিগেজের৷ এবং সঙ্গে ‘ম্যারাডোনাচিত বোমা’ও রয়েছে৷ ‘মেসির সোনার বল পাওয়ার পিছনে কিছু মার্কেটিং পরিকল্পনা রয়েছে’।
প্রাক্তনরা যে অধিকাংশ সময়েই বর্তমানদের সাফল্য দেখতে ভালোবাসেন না, এটা পৃথিবীর সব দেশেই প্রযোজ্য৷ ম্যারাডোনা যে মেসিকে মন থেকে পছন্দ করেন, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই৷ তবু ম্যারাডোনার এই মন্তব্যকে পাগল বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই৷
মেসি সম্পর্কে যাবতীয় রোমান্টিকতার মায়াজাল উড়িয়ে দিয়ে প্রশ্নটা করতেই হবে, শেষ চারটি ম্যাচে শক্তিশালী ইউরোপিয়ান দলগুলোর সামনে তোমার সেই রৌদ্রোজ্জ্বল পারফরম্যান্স কোথায় গেল হে? গোল ছেড়ে দিন৷ তাকে কার্যত নড়তে দেওয়া হয়নি তিনটে ম্যাচে৷
আমাদের দেশে পাড়ায় পাড়ায় মেসির জন্য ভেঙে পড়া ভক্তদের জন্য আর একটি তথ্য৷ আর্জেন্তিনার সেরা ক্রীড়া দৈনিক ‘ওলে’র সমীক্ষায়, ৮৩.৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন, মেসির সোনার বল পাওয়া উচিত নয়৷ এই মেসি-যাকে তারা পোপের উত্তরসূরি বানিয়ে ফেলেছিলেন এতদিন৷ এই মেসি-যাকে তারা ‘পোপ লিও’র পাশে ডাকত ‘মেসিডোনা’ বলে৷
ফাইনাল নতুন করে বোঝাল, মেসি মহামানব নন, আমাদের মতোই মানুষ৷ ইগুয়াইনের দুটে সুযোগ বা পালাসিওর একটা সুযোগের থেকেও, বিরতির পর পাওয়া মেসির একটা সুযোগ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বিশ্ব মিডিয়ায়৷ তুমি মেসি, ওই সুযোগ তুমি হারালে কী করে? মিডিয়া সেন্টারে এতদিন চনমনে আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিকদের বসার জায়গাটা অত ভিড়েও নিঝুম৷ বিরতির পরেই মেসি যে সিটার নষ্ট করলেন, কী করে কেউ বলতে পারছেন না৷ চ্যাম্পিয়ন হয়ে জোয়াকিম লো সহজ গলায় বলছিলেন, ‘মেসিকে বল নিয়ে দৌড়তে দেওয়া চলবে না বলেছিলাম ছেলেদের৷’ তা নোটবই বলছে, মেসি বিদ্যুৎ হয়ে ছিটকে বেরিয়েছেন মাত্র চারবার৷
টুর্নামেন্টে প্রথম থেকেই মনে হয়েছে, এলএম টেন পুরো সুস্থ নন৷ বোঝা যাচ্ছিল না, এটা তাঁর মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠার পূর্বপরিকল্পিত স্ট্র্যাটেজি কিনা৷ ফাইনালে মাঠে দেখলাম, একবার কোমরে হাত দিয়ে ঝুঁকে রইলেন৷ বার্সেলোনায় বমি করার রোগটা কি আবার ফিরে এলো? আর্জেন্তিনার বিশেষজ্ঞরা ধরতে পেরেছেন? প্রশ্ন করতে বুয়েনস আইরেসের এক সাংবাদিক বললেন, ‘না, ধরতে পারেনি৷ মনে হয়, নার্ভের কোনো ব্যাপার৷’
বিশ্বকাপটা হাতে ধরতে ঠিক কেমন লাগে? বার্সেলোনায় প্র্যাক্টিসের ফাঁকে যাদের এই প্রশ্নটা করতেন মেসি, কাকতালীয় ভাবে তাদের অন্তত দু’জন রোববার ছিলেন মারাকানায়৷ পিকে ও পুজোল৷ মেসি মাঠে নামার ঠিক আগে তার সঙ্গে কথা বলে গালে একটা আদরের টোকা মেরে গেলেন পুজোল৷
ভাবছিলাম, ওই বিশ্বজয়ী সতীর্থর স্পর্শেও যদি মেসির বিশ্বকাপ ভাগ্য খোলে৷ খুলল না৷ কারণ, সোজা কথায়, এই আর্জেন্তিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দল ছিল না৷ মেসি নামক মোমবাতিতে জ্বলে উঠেছিল৷ দি মারিয়া, আগুয়েরো চোট পাওয়ার দলটা হয়ে গেল দু’জনের৷ মেসি ও মাসচেরানোর৷ সাবেল্লার অবিশ্বাস্য ভুল, লাবেসিকে বসিয়ে আগুয়েরোকে নামানো৷ কেন লাবেসিকে বসানো হলো? প্রশ্নটা তুলেছেন ম্যারাডোনা ও মোরিনহোও৷ এর মধ্যে এগারো জনের জার্মানদের যে তারা ফাইনালে ১১৩ মিনিট পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, এটাই বিশাল ব্যাপার৷
মেসির জন্যই আর্জেন্তিনা দলটা কুড়িয়েছিল সমীহ, শ্রদ্ধা, ভয়, আন্তর্জাতিক প্রচার৷ তিনিই গোলের বল বাড়াবেন, তিনিই গোল করবেন-এখনকার ফুটবলে রোজ রোজ হয় না৷ বিপক্ষের ভিডিও অ্যানালিস্টরা ধরিয়ে দেন, এর ঘোরার অঞ্চলটা কতটুকু৷
সোনার বল হাতে বেরোনোর সময় মিক্সড জোনে মেসি বলে গেলেন, ‘এই মুহূর্তে সোনার বলের গুরুত্ব আমার কাছে খুবই কম৷ আমি শুধু কাপটা জিতে আর্জেন্তিনায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম৷ আমাদের জেতাটা দরকার ছিল খুব৷’ গলায় আক্ষেপ, ‘ওদের পজেশন ভালো ছিল৷ কিন্ত্ত সহজ সুযোগ আমরাই বেশি পেয়েছিলাম৷ ওই একটা গোল হয়ে গেলে খেলাটা বদলে যেত৷’
ওই একটা গোল হয়ে গেলে…৷ ওই একটা গোল হয়ে গেলে..৷ এই আক্ষেপটা হয়তো আজীবন তাড়া করে যাবে মেসিকে৷ বার্সেলোনায়, বুয়েনস আইরেসে, রোসারিওতে, যেখানেই যান৷ মেসির বয়সে ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গিয়েছে৷ তার পরেও রয়েছে দেশে ফুটবল প্রতিভার জোয়ার৷ মস্কোয় বিশ্বকাপে মেসি কাদের পাবেন সঙ্গে? রোমেরো, রোখো, ফের্নান্দো! দি মারিয়া, ইগুয়াইন, আগুয়েরোর তিরিশ হয়ে যাবে! মেসি তখন ঠিক ৩১৷
কোপাকাবানা সৈকতের দিকে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে রাত এগারোটাতেও বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে আর্জেন্টিনীয়রা৷ এ বার দেশে ফেরার পালা৷ চলো যাই৷ পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন স্থানীয় ব্রাজিলেইরোরা৷ আর্জেন্টিনীয়রা আর তাদের দেখে গাইছেন না, ‘সিয়ে সিয়ে সিয়ে’৷ তারা তখন মেসির মতোই ভাবছিলেন হয়তো৷ ওই একটা গোল হয়ে গেলে…৷ ওই একটা গোল হয়ে গেলে…।

লেখক সম্পর্কে

স্পোর্টসবাংলা ডেস্ক

স্পোর্টসবাংলা ডেস্ক

এই ধরনের আরো লেখা

০ মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য আসেনি!

এই মুহূর্তে এখানে কোনো মন্তব্য নেই, আপনি কি একটি মন্তব্য দেবেন?

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০২০
সোমমঙ্গলবুধবৃহস্পতিশুক্রশনিরবি
« আগস্ট  
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০