Sports Bangla

আধুনিক ও কিংবদন্তীদের রাজা

আধুনিক ও কিংবদন্তীদের রাজা

আধুনিক ও কিংবদন্তীদের রাজা
জানুয়ারি ১৩
১৪:১৫ ২০১৫

royal-magnum_bigএতগুলো অস্কার জিতেছেন, দুর্দান্ত অভিনয়। টম হ্যাংকসকে দেখলে মনে হয় পাশের বাড়ির বড় ভাই। সুপারস্টার তো নয়ই। ১০০টি সেঞ্চুরি, সঙ্গে কত যে রেকর্ড! শচিন টেন্ডুলকার তারপরও নরম, ভদ্র, বিনয়ী, সারাক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে চলেন। ডব্লিউ জি গ্রেসের অত বিনয়-টিনয়ের সময় নেই। ব্রিটিশ ক্রিকেট অ্যানালিস্ট ডেফিড ফ্রিথের মতে, ৬ ফুট দীর্ঘ শরীর, বিশাল বপু যেমন, তেমনি অলওয়েক ইমপোজিং, ডমিনেটিং, অ্যাট টাইমস বাম্পটাওস (অহংকারী)। এমনই ব্রিস্টলের ডক্টর। সে ক্রিকেটের দস্যু। ব্যাটিংয়ের প্রথম কথা, বোলিংয়ে প্রস্তুর যুগের সোবার্স।

ইয়ান বোথাম ইতিবাচক দিকটাই হাইলাইট করছেন, ‘সে ক্রিকেটে আমাদের সবার পিতার মত। এবং অবশ্যই প্রথম সুপারস্টার।’ সাবেক বিশ্লেষক মুরগাট্রয়াড বলছেন ‘ব্যাক ফুট’কি ‘ফ্রন্টফুট’-ব্যাটিংয়ের বিভিন্ন কৌশলের বিষয়টি সেই প্রথম ঠিকঠাক করেছে। যদি উনবিংশ শতাব্দীতে ক্রিকেটের ম্যানুয়াল লেখা হতো, সেটা গ্রেসই লিখতেন। ৩২ বছরে টেস্ট অভিষেক। প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৫২। পরের শতকটি ১৭০ রানের। আরো আছে ৫টি ফিফটি। সব মিলিয়ে ১০৯৮ রান। গড় ৩২.২৯। উইকেট ৯টি।

FMC-Sports-logo-300x133টেস্ট পরিসংখ্যান দিয়ে গ্রেসের বিচার করলে জর্জ বেস্টকে ফুটবল বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান নিয়ে মাপতে হবে! সেটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ৮৭০টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৫৪,২১১ রান। ১২৪টি শতক। গড় ৩৯.৪৫। উইকেট ২৮০৯টি। এরচেয়ে বেশি রান জ্যাক হবসের আছে। গ্রেস এখানেও অনন্য হতে পারছেন না। এবার মোট হিসেবটা দেখুন। সবকিছু নথিভূক্ত করা যায়নি। বাষ্পইঞ্জিনের যুগে সেটা সম্ভব ছিল না। ওভাবে কেউ ভাবেওনি। ধারণা করা হয়, সবধরণের ক্রিকেটে এই দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের রান লক্ষাধিক (১০২০০০); উইকেট ৭৫০০! সেঞ্চুরি ২২৪টি। মারা গেছেন শতবর্ষ হতে চলল; এখনও ক্রিকেটে তিনি প্রাসঙ্গিক, আধুনিক ও কিংবদন্তীদের রাজা। সে আমলে উইকেট আনকাভার্ড থাকতো। ইলেকট্রিক আউটফিল্ডের প্রশ্নই উঠে না। চতুর্দিকে বড় বড় ঘাস। বেশিরভাগ রানই আসতো দৌড়ে। হেলমেট পরেছেন কখনও একথা শোনা যায়নি। তাই ডব্লিউ জি গ্রেস এক বিস্ময়। ক্রিকেটের দৈত্য, মানবিক ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী। তাকে কাট করতে দেখেছেন একথা শেষবার যিনি বলেছিলেন সেই সোয়ানটনও বেঁচে নেই।

‘সম্ভবত ১৯১০ সালের দিকে ফরেস্ট হিল গ্রাউন্ডে গ্রেস যখন ব্যাট করছিলেন আমি তখন প্যারামবুল্যাটরে!’ বলেছেন উনিবংশ শতাব্দীর ক্রিকেটের উপর তৈরী একটি প্রামান্যচিত্রের ন্যারেটর সোয়ানটন। সেখানে দু’একটি জায়গায় দেখা গেছে গ্রেসকে। ১৮৪৮ সালে জন্ম। প্রথম শ্রেণীর অভিষেক ১৮৬৫ সালে। অবশ্য গ্রেস এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, ৯ বছর বয়সে গ্লুচেস্টারশায়ারের হয়ে ১১ ইনিংসে ব্যাট করেছেন তিনি। ডিটেইলস নেই, তবে এটা নিশ্চিত সেটা প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ ছিল না। ১৯৬৪ সালে পশ্চিম গ্লুচেস্টারশায়ারের হয়ে ৫১ করেছিলেন, এই তথ্যটি সমর্থিত।

Bright-sports-shop_bigইংল্যান্ড একাদশের হয়ে প্রথম শতক সারের বিপক্ষে, ২২৪। ১৮৬৮ থেকে ৭৪, এই সময়ের মধ্যে গ্রেস করেছেন ৫০টি প্রথম শ্রেণীর সেঞ্চুরি। অন্য যে কারো সেঞ্চুরির সংখ্যা ১০টির বেশি নয়। ১৮৭১ সাল ইংলিশ ক্রিকেটের লোকগাথাঁয় ঢুকে গেছে। সেবার সব ধরনের ক্রিকেটে ১৭টি সেঞ্চুরি করেন গ্রেস। নিজে জানিয়েছেন, প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে সংখ্যাটা ১০। ১৮৭০ থেকে ৮৬ এই সময়ের মধ্যে ১০ বার মৌসুমে নুন্যতম দেড় সহস্রাধিক রান ও ১০০টি উইকেট নিয়েছেন। ৭৮ সালে পারেননি। সেবার তার মেডিক্যাল স্কুলে প্র্যাকটিসের জন্য প্রচুর খাটাখাটনি করতে হয়েছে। শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় দক্ষতার কারণেই অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে ছাত্র হওয়ার প্রস্তাব ছিল তার কাছে। কিন্তু বাবার ইচ্ছেয় শেষমেষ ব্রিস্টলের মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু গ্রেসের রক্তে ক্রিকেট, রোগী দেখার সময় কোথায়? সব মিলিয়ে ৩ বছর জেনারেল প্র্যাকটিশনারের কাজ করেছেন। ১৮৭৬ সালে একটি নন ফার্স্টক্লাস ম্যাচে ইউনাইটেড সাউথ ইলেভেনের হয়ে ব্যাট করছিলেন গ্রেস। ৬ রানে এলবিউব্লিউ। হাত না উঠিয়ে উপায় ছিল না আম্পায়ারের। কিন্তু মাঠ ছাড়তে নারাজ গ্রেস। তারপর আম্পায়ারকে উদ্দেশ্য করে সেই বিখ্যাত উক্তি ‘লোকজন তোমাকে নয়-আমার ব্যাটিং দেখতে এসেছে।’

সে ম্যাচে ৪০০ রান করেন গ্রেস। এবং প্রতিটি রান দৌড়ে। আসলে স্কোর ছিল ৩৯৯। খেলাশেষে স্কোরারকে দিয়ে জোড় করে ৪০০ করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। এমনই আত্মকেন্দ্রিক, রগচটা ও অসম্ভভ গোঁয়ার ছিলেন গ্রেস। এগুলিকে সবসময় দমিয়ে রেখেছে তার প্রতিভা, খেলাটির প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা, দানবীয় সব অর্জন। মুরগাট্রয়াও জানাছেন, ‘সেদিন ৪০০ করে প্রতিযোগীতায় প্রথম হয়েছেন। টেনিস ভাল খেলতেন, ব্যাডমিন্টনও। হি ওয়াজ এ্য ট্রু চ্যাম্পিয়ন।’

৪০০ করার ঠিক পরের ম্যাচে নটিংহামশায়ারের বিপক্ষে ক্লিফটনে করেন ১৭৭। পরের ম্যাচে ব্রিসটলে সফরকারী দল ইয়কশায়ার ভেবেছিল, যাক আমাদের রক্ষা। ও ক্লান্ত হয়ে আছে। তাদের যুগপৎ হতাশ ও বিস্মিত করে ৩১৮ করলেন গ্রেস। ১৫ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় যার ইহলীলা সাঙ্গ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল, ২০ বছর বয়সে তার সম্পর্কে ক্রিকেট লেখক সায়মন রে লিখেন ‘সন্দেহাতীতভাবে সে সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান। সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন।’

ambia Logo১৮৭১ সালে ইউনাইটেড নর্থের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে গ্রেসকে শূন্য রানে আউট করেন জেম শ। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬৮ করে তার জবাব দিয়েছিলেন গ্রেস। ‘আমি আমার ইচ্ছেমতো জায়গায় বল ফেলছিলাম। সে তার ইচ্ছেমতো জায়গায় বল পাঠাচ্ছিল’ম্যাচশেষে বলেছিলেস জেম শ। ১৮৬৮ সালে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে প্রথম দু’ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন। এর আগে ১৮১৭ সালে সর্বপ্রথম এই কাজটি করেছিলেন উইলিয়াম ল্যাম্বার্ট।

১৮৮৫ সালে তার ৫০তম জন্মবার্ষিকি উৎযাপন করতে জেন্টলম্যান (অ্যামেচার) ও প্লেয়ারসদের (প্রফেশনাল) মধ্যে একটি ম্যাচ আয়োজন করে এমসিসি। ২৮৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে জন্মদিন ও লর্ডসকে আলোকিত করেন। ততদিনে ডব্লিউ জি গ্রেস রানী ভিক্টোরিয়া ও গ্ল্যাডস্টোনের পর ব্রিটেনের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

১৮৭৩-৭৪-এ প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফর। সবার সামনে স্বাগতিক আম্পায়ারদের অদক্ষ ও ‘পক্ষপাতপুষ্ট’বলে অভিযোগ করেন গ্রেস। তার একঁগুয়েমি ও হঠকারী চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হলো অস্ট্রেলিয়া। বউ অ্যাগনেসকে সঙ্গে নিয়েছিলেন গ্রেস, সেটা ছিল তার মধুচন্দ্রিমা। মাঠে টস করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে অবিশ্বাস করেছেন। সতীর্থদের যেখানে সেখানে অপদস্থ করেছেন। মাঠেও অধিনায়ক হিসেবে তার আচরণ প্রশ্নাতীত ছিল না। ট্যুর সম্পর্কে ডেভিড ফ্রিথ লিখেছিলেন, ‘দ্য ক্যাপটেন কুড নট হেলপ হিমসেলফ।’ উনিশ শতকের দুর্দান্ত ফাস্ট বোলার জর্জ লোহম্যান ভীষণ ক্ষেপেছিলেন- আমি কখনও তার গ্রেসের সঙ্গে সফর করবো না। অন্তত এক হাজার সপ্তাহের মধ্যে নয়। পরে বলেছিলেন লোহম্যান। ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ড সফর করছিল অস্ট্রেলিয়া। লর্ডসে মিডলসেক্সের বিপক্ষে তাদের খেলা। আগের বছর কাউন্টি খেলতে গ্লুচেস্টাশায়ারে আসা বিলি মিডউইন্টার স্বভাবতই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলবেন। ওদিকে ওভালে খেলা পরেছে গ্লুচেস্টারশায়ারের। তাদের আবার একজন খেলোয়াড় কম। ব্যয়বহুল এক ট্যাক্সি ভাড়া করে ওভাল থেকে লর্ডসে চলে আসেন গ্রেস।

সঙ্গে ভাই ই এম গ্রেস ও আরো ক’জন। ৩/৪ জনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির পর মিড উইন্টারকে লর্ডস থেকে বের করে সোজা নদীর ওপারে ওভালে চলে আসেন গ্রেস। অস্ট্রেলীয়দের গালমন্দও করেন তিনি। ঘটনায় বেজায় ক্ষুব্ধ হন সফরকারী দলের অধিনায়ক জন কনওয়ে। ক’দিন পরে ক্লিফটন কলেজে মিডউইন্টারহীন গ্লুচেস্টারশায়ারকে পরাজিত করে মধুর প্রতিশোধ নেয় অস্ট্রেলিয়া। এ সমস্ত কারণেই ক্রিকেটার হিসেবে ‘অলরাউন্ডার’হয়েও টেস্ট ক্যাপটেন হতে ১০ ম্যাচ অপেক্ষা করতে হয় গ্রেসকে। জনপ্রিয় ও পরিচিত হলেও এমসিসির বড় কর্তা লর্ড হ্যারিস, এজি স্টিল ও হর্নবির মতো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল না তার। ১৯০৮ সালে ৬০ বছর বয়সে শেষ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেন ডব্লিউ জি গ্রেস।

ইল্টহামের হয়ে ওভালে সেদিন ৬৯ করেছিলেন তিনি, এই ওভালেই ৪৩ বছর আগে শুরু হয়েছিল গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন খোঁড়া! গ্রেসের ক্যারিয়ারকে গ্রান্ড ক্যানিয়নের সঙ্গে তুলনা করা মোটেই বাহুল্য নয়। এর আগে ১৯০৫ সালে ৫১ বছর বয়সে খেলে ফেলেছেন শেষ টেস্ট। ম্যাচশেষে বলেছিলেন ‘আই ক্যান স্টিল ব্যাট বাট ক্যান্ট বেন্ড মাই বডি!’ প্রায়ই গ্রেসকে শুনতে হতো ক্রিকেটার হয়েই জন্মেছিলেন কিনা?

‘না, কোচিং ও অনুশীলনের মাধ্যমে তৈরী হয় ক্রিকেটার। তবে আমার আশপাশটা ছিল ক্রিকেটময়’-কথা সত্যি। ছেলের খেলাধুলায় ব্যাপক উৎসাহ দিতেন বাবা-মা। ১৮৬০ সালে গ্লুচেস্টারশায়ারের অধিনায়ক জর্জ পারকে লেখা এক চিঠিতে গ্রেসের মা মার্থা বলেন, ‘উইলিয়াম গ্রেসকে আপনার দলে নিতে পারেন। ভবিষ্যতে সে একজন ভালো ব্যাটসম্যান হবে। হিজ ব্যাক ট্রোকস আর সাউন্ডার অ্যান্ড অলওয়েজ প্লেজ স্ট্রেইট ব্যাট!’ বোলার গ্রেস দারুণ ছিলেন। শিক্ষানবীশ ব্যাটসম্যানরা উইকেটে আসলে যেদিকে সূর্য সেদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলতেন ঐ দেখ, পাখি উড়ে যায় (কাল্পনিক)। স্বভাবতই সূর্য্যরে দিকে তাকিয়ে ‘আইসাইড’ বিঘ্নিত হত ব্যাটসম্যানের। পরের বলে আউট! প্রিয় পজিশন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে সারাক্ষণ উপদেশ দিতেন ব্যাটসম্যানদের। তার যে কর্কশ গলা, তাতে বিরক্তই হতো ব্যাটসম্যানরা।

লন্ডন সমাজ, সাধারণ মানুষ পাগলের মতো ভালবাসতো ক্রিকেটার গ্রেসকে, কিন্তু মানুষ গ্রেসের উপর তাদের বিরক্তিও ছিল। ১৮৭৮ সালে লর্ডস-এ এমসিসিকে ৯ উইকেটে হারায় অস্ট্রেলিয়া। গ্রেসসহ এমসিসি অনেক শক্তিশালী দল ছিল, তাই ঐ পরাজয় ভীষণ ধাক্কা দেয় ইংল্যান্ডবাসীকে।

Ambia all-

লেখক সম্পর্কে

স্পোর্টসবাংলা ডেস্ক

স্পোর্টসবাংলা ডেস্ক

এই ধরনের আরো লেখা

০ মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য আসেনি!

এই মুহূর্তে এখানে কোনো মন্তব্য নেই, আপনি কি একটি মন্তব্য দেবেন?

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য লিখুন

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০২০
সোমমঙ্গলবুধবৃহস্পতিশুক্রশনিরবি
« আগস্ট  
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০